বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের পর ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণে ব্যাপক রদবদল ঘটেছে। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে নিষিদ্ধ ঘোষিত সন্ত্রাসী দল আওয়ামী লীগের পতনের পর, দলটির নেত্রী এবং অসংখ্য গুম-খুন ও গণহত্যার দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিক আশ্রয় দেয় প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশের ওপর একপ্রকার মনস্তাত্ত্বিক চাপ প্রয়োগের উদ্দেশ্যে তারা একতরফাভাবে বাংলাদেশীদের জন্য ভিসা প্রদান বন্ধ করে দেয়। কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে আবেগ বা জেদের চেয়ে অর্থনীতির জোর যে অনেক বেশি, তা প্রমাণ হতে সময় লাগেনি।

পশ্চিমবঙ্গের অর্থনৈতিক পঙ্গুত্ব

ভিসা বন্ধের এই হঠকারী সিদ্ধান্তের সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি এসে পড়ে খোদ পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতির ওপর। কলকাতার নিউমার্কেট, মার্কুইস স্ট্রিট, সদর স্ট্রিটের শত শত হোটেল, রেস্তোরাঁ এবং ছোট-বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান মূলত বাংলাদেশী পর্যটকদের ওপর নির্ভরশীল। এর পাশাপাশি চেন্নাই, ভেলোর এবং কলকাতার বিশাল চিকিৎসাসেবা খাতও বাংলাদেশী রোগীদের অর্থে ফুলেফেঁপে উঠেছিল। ভিসা বন্ধ থাকার টানা দুই বছরে এই ব্যবসাগুলোতে ধ্বস নামে। খদ্দেরের অভাবে বহু দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়, হাসপাতালে রোগীর আকাল দেখা দেয় এবং পশ্চিমবঙ্গের ব্যবসায়ীরা চরম অস্তিত্ব সংকটে পড়েন। শেষমেশ নিজেদের অর্থনীতিকে বাঁচাতেই দীর্ঘ দুই বছর পর তারা পুনরায় ভিসা চালু করতে বাধ্য হয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশ তাদের অর্থনীতির একটি বিশাল চালিকাশক্তি। আমাদের মনে রাখতে হবে: ভারতের ভেতরে ক্রমাগতভাবে চরমপন্থার উত্থান ঘটছে। ইসলাম ধর্মাবলম্বী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর রাষ্ট্রীয় মদদে বা উগ্র গোষ্ঠীগুলোর দ্বারা যে অবর্ণনীয় অত্যাচার ও বৈষম্য চালানো হচ্ছে, তা কোনোভাবেই একটি গণতান্ত্রিক বা ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের আচরণ হতে পারে না। এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ এবং একটি বিশেষ নিষিদ্ধ সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে পুনর্গঠনে সহায়তা করার যে নীল নকশা তারা বুনছে, তা সরাসরি আমাদের সার্বভৌমত্বের প্রতি হুমকিস্বরূপ। তাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে এখনো সেই 'দাদাগিরি' বা আধিপত্যবাদী মানসিকতা প্রবলভাবে বিরাজমান।

কেন বয়কটই হতে পারে মোক্ষম জবাব?

যে রাষ্ট্র আমাদের দেশের একজন পলাতক ও দণ্ডিত অপরাধীকে আশ্রয় দেয় এবং আমাদের ধর্মীয় মূল্যবোধ ও জাতিসত্তাকে প্রতিনিয়ত অবজ্ঞা করে, তাদের অর্থনীতিকে আমাদের কষ্টার্জিত মুদ্রা দিয়ে টিকিয়ে রাখার কোনো যৌক্তিকতা নেই। ১. অর্থনৈতিক কূটনীতির প্রয়োগ: আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে 'বয়কট' একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও অহিংস অস্ত্র। আমরা যদি সম্মিলিতভাবে পর্যটন, কেনাকাটা এবং চিকিৎসা সেবার জন্য ভারতকে বয়কট করি, তবে সেটি তাদের নীতি-নির্ধারকদের ওপর প্রবল চাপ সৃষ্টি করবে। পশ্চিমবঙ্গের ব্যবসায়ীদের আর্তনাদই প্রমাণ করে আমাদের অর্থনৈতিক ক্ষমতা কতটুকু। ২. বিকল্প গন্তব্যের সন্ধান: চিকিৎসা ও পর্যটনের জন্য আমাদের থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর বা তুরস্কের মতো বিকল্প গন্তব্যগুলোর দিকে নজর দেওয়া উচিত। এই দেশগুলোতে পর্যটকদের যেমন সম্মান করা হয়, তেমনি তাদের পেশাদারিত্বও অনেক উন্নত। ৩. অভ্যন্তরীণ কাঠামোর উন্নয়ন: এই সুযোগে বাংলাদেশের উচিত নিজেদের চিকিৎসা ব্যবস্থাকে বিশ্বমানের করে গড়ে তোলা এবং দেশীয় পর্যটন শিল্পের বিকাশে বিনিয়োগ করা। আমাদের টাকা দেশেই থাকুক, দেশের অর্থনীতি শক্তিশালী হোক। বাংলাদেশীদের টাকায় যাদের পেট চলে, তাদের আধিপত্যবাদ ও রক্তচক্ষু মেনে নেওয়ার দিন শেষ। ভিসা চালু করা তাদের কোনো মহানুভবতা নয়, বরং নিজেদের দেউলিয়া অর্থনীতিকে বাঁচানোর মরিয়া চেষ্টা মাত্র। সাম্প্রদায়িক উগ্রতা, মুসলিমদের ওপর নিপীড়ন এবং স্বাধীন বাংলাদেশের ওপর খবরদারি করার মানসিকতার প্রতিবাদস্বরূপ আমাদের উচিত স্বপ্রণোদিত হয়ে ভারতকে বয়কট করা। আত্মমর্যাদাশীল জাতি হিসেবে আমাদের এখন সময় এসেছে নিজেদের শক্তির জায়গাটি চিনে নেওয়ার। আমাদের বয়কট ই হোক আমাদের সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক হাতিয়ার। প্রকাশনায়: অপরাধনামা আন্তর্জাতিক ডেস্ক