প্রতিবেশী দুই দেশের সংখ্যালঘু পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে এক চরম অস্থিতিশীলতার জন্ম দিচ্ছে। একদিকে ভারতে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির প্রভাবে মুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর কাঠামোগত নির্যাতন ও ঐতিহাসিক স্থাপনা ধ্বংসের ঘটনা তীব্র হচ্ছে। অন্যদিকে ভারতীয় গণমাধ্যমের একাংশ বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের মিথ্যা ও অতিরঞ্জিত দাবি তুলে অপতথ্যের বা ডিসইনফরমেশন এর এক সুপরিকল্পিত জাল বুনছে। বিশ্লেষণমূলক দৃষ্টিকোণ থেকে এই দ্বিমুখী নীতি ও প্রোপাগান্ডার পেছনের ভূ-রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ও সত্যতা উদ্ঘাটন করা আজ অত্যন্ত জরুরি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতে সংখ্যালঘু, বিশেষ করে মুসলিমদের ওপর হামলা কেবল বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, বরং এটি এক ধরণের কাঠামোগত ও রাষ্ট্রীয় মদদপুষ্ট নিপীড়নে পরিণত হয়েছে। উন্নয়ন বা অবৈধ স্থাপনার ধোয়া তুলে সুনির্দিষ্টভাবে মুসলিমদের বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং শত শত বছরের পুরোনো মসজিদ ও মাজার গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। আইনি প্রক্রিয়ার তোয়াক্কা না করে এই বুলডোজার নীতি মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। গো-রক্ষার নামে মব লিঞ্চিং, হিজাব বিতর্ক এবং নাগরিকত্ব আইনের মাধ্যমে ভারতের বিশাল মুসলিম জনগোষ্ঠীকে প্রান্তিকীকরণের চেষ্টা চলছে। ইতিহাসবিদদের মতে, পাঠ্যপুস্তক থেকে মুঘল ইতিহাস বাদ দেওয়া এবং প্রত্নতাত্ত্বিক দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইসলামি স্থাপনাগুলোকে টার্গেট করে ধ্বংস করা মূলত একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব ও অবদান মুছে ফেলার সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র। নিজেদের দেশের চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের চিত্র আড়াল করতে ভারতীয় মূলধারার গণমাধ্যম এবং রাজনৈতিক আইটি সেলগুলো বাংলাদেশের বিরুদ্ধে এক নজিরবিহীন প্রোপাগান্ডা যুদ্ধে নেমেছে। বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর কাল্পনিক বা অতিরঞ্জিত হামলার চিত্র তুলে ধরে তারা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কোন্দল, ব্যক্তিগত শত্রুতা, কিংবা সম্পূর্ণ ভিন্ন দেশের পুরোনো ও অসম্পর্কিত ভিডিও ব্যবহার করে সেগুলোকে বাংলাদেশে হিন্দু নির্যাতন বলে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক ফ্যাক্ট-চেকাররা বারবার প্রমাণ করেছেন যে, ভারতীয় গণমাধ্যমে প্রচারিত এসব খবরের বেশিরভাগই সম্পূর্ণ বানোয়াট।
বাংলাদেশে যেকোনো রাজনৈতিক বা স্থানীয় সংঘাত ঘটলেই ভারতীয় মিডিয়া সেটিকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ধর্মীয় রং দিচ্ছে। এর মাধ্যমে তারা একটি বিকৃত ন্যারেটিভ তৈরি করছে, যা মূলত তাদের নিজস্ব হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির ভোটব্যাংক সুসংহত করার হাতিয়ার। বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের এই অপপ্রচারমূলক কৌশলের পেছনে বেশ কয়েকটি সুনির্দিষ্ট ভূ-রাজনৈতিক ও অভ্যন্তরীণ কারণ রয়েছে। ভারতের অভ্যন্তরীণ বেকারত্ব, অর্থনৈতিক সংকট এবং মণিপুরের মতো রাজ্যে জাতিগত দাঙ্গার ব্যর্থতা থেকে জনগণের দৃষ্টি অন্যদিকে সরাতে বাংলাদেশের পরিস্থিতিকে অতিরঞ্জিত করে উপস্থাপন করা হচ্ছে। আক্রান্ত হিন্দু ন্যারেটিভ তৈরি করে উগ্র ডানপন্থী ভোটারদের সহানুভূতি ও সমর্থন আদায় করা এই অপতথ্যের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। পাশাপাশি মনস্তাত্ত্বিক চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও পররাষ্ট্রনীতির ওপর অন্যায্য প্রভাব বিস্তারের চেষ্টাও এই প্রোপাগান্ডার একটি বড় অংশ বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। ভারত যখন নিজের দেশের সংখ্যালঘুদের রক্ত ও ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে বিশ্বের সর্ববৃহৎ গণতন্ত্রের দাবি করছে, ঠিক তখনই পার্শ্ববর্তী দেশের দিকে মিথ্যা অভিযোগের আঙুল তোলা তাদের নৈতিক দেউলিয়াপনাকেই স্পষ্ট করে। বাংলাদেশে সংখ্যালঘু অধিকার সংরক্ষণে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকভাবে যেকোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনার দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা হচ্ছে, যা ভারতের বুলডোজার নীতির সম্পূর্ণ বিপরীত। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা, জাতিসংঘ এবং গ্লোবাল ফ্যাক্ট-চেকিং প্ল্যাটফর্মগুলোর উচিত ভারতের এই রাষ্ট্রীয় মদদপুষ্ট প্রোপাগান্ডা এবং কাঠামোগত মুসলিম নিগ্রহের বিরুদ্ধে কঠোর ও নিরপেক্ষ তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া। দক্ষিণ এশিয়ার শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে হলে অপতথ্যের এই বিষাক্ত রাজনীতি অবিলম্বে বন্ধ হওয়া প্রয়োজন।